০৬:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

সবুজ ক্যাম্পাসে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র: জাবি WRC

সাভারের সবুজ ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শুধু পরিযায়ী পাখির জন্যই নয়, বরং বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের প্রাণ বাঁচানোর এক নীরব যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক দেশের একমাত্র ‘বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্র’ (Wildlife Rescue Centre – WRC) এখন হয়ে উঠেছে আহত ও পাচার হওয়া প্রাণীদের একমাত্র আশ্রয়স্থল।

​মৃত্যু পথযাত্রীদের ‘সঞ্জীবনী’

​প্রায় ১০ একর ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিকভাবে ঘেরা এই কেন্দ্রে ঢুকলেই দেখা মেলে মানুষের নিষ্ঠুরতা কিংবা দুর্ঘটনার শিকার হওয়া নানা প্রাণীর। কেউ পাচারকারীর খাঁচা থেকে উদ্ধার হওয়া বিরল প্রজাতির প্যাঁচা, কেউবা লোকালয়ে পিটুনির শিকার হওয়া গন্ধগোকুল বা বনবিড়াল। এখানে তাদের পরম মমতায় চিকিৎসা দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একঝাঁক তরুণ গবেষক ও শিক্ষক।
​কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা ফিরোজের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ২০০৪ সাল থেকে এটি কার্যক্রম শুরু করে। মূলত বিপন্ন প্রাণীদের উদ্ধার, সুস্থ করে তোলা এবং পরবর্তীতে তাদের নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করাই এই কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য।

​একুশ বছরের নীরব লড়াই

​WRC-এর কার্যক্রম কেবল চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে প্রাণীদের বন্য স্বভাব বজায় রাখার জন্য কৃত্রিম অরণ্যের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। কোনো প্রাণীকে সুস্থ করার পর তাকে সরাসরি বনে ছাড়া হয় না; বরং দেখা হয় সে নিজে শিকার করে খাওয়ার সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে কি না।
​বিগত বছরগুলোতে এই কেন্দ্রটি থেকে কয়েকশ অজগর, বিলুপ্তপ্রায় কচ্ছপ, ঈগল এবং বিরল প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে তাদের আপন ঠিকানায়। এটি কেবল একটি সেবা কেন্দ্র নয়, বরং দেশের বন্যপ্রাণী গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।

​সীমিত সাধ্য, অসীম সাহস

​অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও কেন্দ্রটি চলছে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের একটি পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও এখানে পর্যাপ্ত আধুনিক চিকিৎসার সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। নিজস্ব কোনো স্থায়ী বাজেট না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত বরাদ্দ আর গবেষকদের পকেটের টাকা ও অনুদানেই চলে অনেক প্রাণীর পথ্য ও চিকিৎসা।
​কেন্দ্রটির সাথে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যানিমেল অ্যাম্বুলেন্স এবং আধুনিক প্যাথলজিক্যাল ল্যাব থাকলে আরও অনেক প্রাণীকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো।

​জনসচেতনতার নতুন দিগন্ত

​WRC-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো জনসচেতনতা। আগে সাভার বা পার্শ্ববর্তী এলাকায় বন্যপ্রাণী দেখলে মানুষ পিটিয়ে মারত, কিন্তু এখন তারা প্রাণিবিদ্যা বিভাগে বা উদ্ধার কেন্দ্রে ফোন করে খবর দেয়। এই সামাজিক পরিবর্তনই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাবির এই কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সবুজ ক্যাম্পাসে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র: জাবি WRC

সবুজ ক্যাম্পাসে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র: জাবি WRC

প্রকাশের সময় : ০৪:৪০:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

সাভারের সবুজ ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শুধু পরিযায়ী পাখির জন্যই নয়, বরং বিপন্ন বন্যপ্রাণীদের প্রাণ বাঁচানোর এক নীরব যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক দেশের একমাত্র ‘বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্র’ (Wildlife Rescue Centre – WRC) এখন হয়ে উঠেছে আহত ও পাচার হওয়া প্রাণীদের একমাত্র আশ্রয়স্থল।

​মৃত্যু পথযাত্রীদের ‘সঞ্জীবনী’

​প্রায় ১০ একর ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিকভাবে ঘেরা এই কেন্দ্রে ঢুকলেই দেখা মেলে মানুষের নিষ্ঠুরতা কিংবা দুর্ঘটনার শিকার হওয়া নানা প্রাণীর। কেউ পাচারকারীর খাঁচা থেকে উদ্ধার হওয়া বিরল প্রজাতির প্যাঁচা, কেউবা লোকালয়ে পিটুনির শিকার হওয়া গন্ধগোকুল বা বনবিড়াল। এখানে তাদের পরম মমতায় চিকিৎসা দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একঝাঁক তরুণ গবেষক ও শিক্ষক।
​কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা ফিরোজের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ২০০৪ সাল থেকে এটি কার্যক্রম শুরু করে। মূলত বিপন্ন প্রাণীদের উদ্ধার, সুস্থ করে তোলা এবং পরবর্তীতে তাদের নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করাই এই কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য।

​একুশ বছরের নীরব লড়াই

​WRC-এর কার্যক্রম কেবল চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে প্রাণীদের বন্য স্বভাব বজায় রাখার জন্য কৃত্রিম অরণ্যের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। কোনো প্রাণীকে সুস্থ করার পর তাকে সরাসরি বনে ছাড়া হয় না; বরং দেখা হয় সে নিজে শিকার করে খাওয়ার সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে কি না।
​বিগত বছরগুলোতে এই কেন্দ্রটি থেকে কয়েকশ অজগর, বিলুপ্তপ্রায় কচ্ছপ, ঈগল এবং বিরল প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে তাদের আপন ঠিকানায়। এটি কেবল একটি সেবা কেন্দ্র নয়, বরং দেশের বন্যপ্রাণী গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।

​সীমিত সাধ্য, অসীম সাহস

​অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও কেন্দ্রটি চলছে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। সরেজমিনে দেখা যায়, দেশের একটি পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও এখানে পর্যাপ্ত আধুনিক চিকিৎসার সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। নিজস্ব কোনো স্থায়ী বাজেট না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত বরাদ্দ আর গবেষকদের পকেটের টাকা ও অনুদানেই চলে অনেক প্রাণীর পথ্য ও চিকিৎসা।
​কেন্দ্রটির সাথে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যানিমেল অ্যাম্বুলেন্স এবং আধুনিক প্যাথলজিক্যাল ল্যাব থাকলে আরও অনেক প্রাণীকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো।

​জনসচেতনতার নতুন দিগন্ত

​WRC-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো জনসচেতনতা। আগে সাভার বা পার্শ্ববর্তী এলাকায় বন্যপ্রাণী দেখলে মানুষ পিটিয়ে মারত, কিন্তু এখন তারা প্রাণিবিদ্যা বিভাগে বা উদ্ধার কেন্দ্রে ফোন করে খবর দেয়। এই সামাজিক পরিবর্তনই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাবির এই কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় অর্জন।