০৭:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রতিবাদের নগর: জাহাঙ্গীরনগর

ঢাকা নগরীর কোলাহল ছাপিয়ে সাভারের সবুজ প্রান্তরে গড়ে ওঠা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি সংস্কৃতি, প্রকৃতি, আন্দোলন ও প্রতিবাদের এক অনন্য ঠিকানা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ফিরে দেখা এর ইতিহাস, অবদান ও স্বাতন্ত্র্য।

দেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি ব্যতিক্রমী নাম। এটি শুধু একটি শিক্ষাকেন্দ্র নয় বরং প্রকৃতি , সংস্কৃতি, আন্দোলন ও রাজনীতির এক জীবন্ত স্মারক। প্রতিটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শিক্ষার্থীকে সুযোগ দেয় এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে আবিষ্কার করার। সবুজের এই প্রান্তরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান যুগে যুগে দেশের শিক্ষা, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক বিকাশে অনন্য ভূমিকা রেখেছে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

ঢাকাকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার চাপ কমানো এবং একটি আধুনিক, পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাভারের নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশকে বেছে নেওয়া হয় পরিকল্পিত শিক্ষা নগরী হিসেবে। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি মাত্র চারটি বিভাগ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় টি জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় নামে যাত্রা শুরু করলেও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম উপাচার্য ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মফিজ উদ্দিন।

প্রথম ব্যাচে মাত্র ১৫০ জন শিক্ষার্থী এবং ২১ জন শিক্ষক নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়টি দ্রুত প্রসারিত হয়। নতুন নতুন বিভাগ ও অনুষদ স্থাপিত হয়, যা জাহাঙ্গীরনগরকে দেশের উচ্চশিক্ষার এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে।

শিক্ষা কাঠামো

বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৪ টি বিভাগ এবং ৪টি ইনস্টিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪,০০০। সাত শতাধিক শিক্ষক এবং প্রায় ১৮০০ কর্মকর্তা- কর্মচারী নিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কলা, জীববিজ্ঞান থেকে শুরু করে পরিসংখ্যান, অর্থনীতি ও পরিবেশবিদ্যা—প্রতিটি শাখায় রয়েছে গবেষণাভিত্তিক পাঠদান।

পূর্ণ আবাসিক ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন এখানে শুধু ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ থাকে না; হলকেন্দ্রিক জীবনযাপন থেকেই গড়ে ওঠে নেতৃত্ব, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও খেলাধুলার কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে, যা তাদের সমগ্র বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সময় অবদান

১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় জন্মলগ্ন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর। নবীন ক্যাম্পাস হওয়া সত্ত্বেও এর শিক্ষক ও প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সরাসরি রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র কাজী আনিসুর রহমান জাবির প্রথম শহীদ শিক্ষার্থী হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
ক্যাম্পাসে অবস্থিত স্থপতি হামিদুজ্জামান খানের ‘সংশপ্তক’ ভাস্কর্য এবং ৭১ ফুট উচ্চতার দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনার আজও শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা জোগায়।
শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে, যা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।

উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ, শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও নাগরিক চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশ নয়, তারা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের অংশীদার হিসেবে কাজ করে চলেছে।

সংস্কৃতি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমান্তরালে এ ক্যাম্পাসে গড়ে উঠেছে এক ঋদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাট্যতত্ত্ব বিভাগ এই বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়, যা নাট্যচর্চায় বিপ্লব এনেছে। প্রতি বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলা, হিম উৎসব এবং বর্ণিল বর্ষবরণ অনুষ্ঠান জাবির আঙিনাকে মুখরিত রাখে। সেলিম আল দীন ও হুমায়ুন ফরীদির মতো কিংবদন্তিদের পদচারণায় ধন্য এই ক্যাম্পাসে মুক্তমঞ্চের নাটক থেকে শুরু করে দেয়ালিকা ও আবৃত্তি চর্চা এক ভিন্ন মাত্রা পায়। অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

প্রকৃতি ও অতিথি পাখির অভয়ারণ্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মানেই সবুজ, জলাশয় আর মুক্ত প্রকৃতি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র আবাসিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা ‘অতিথি পাখির স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে পরিচিত। লাল মাটির এই ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় অসংখ্য জলাশয় ও লেক শীতকালে সুদূর সাইবেরিয়া ও হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা হাজারো পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। এই অভয়ারণ্যে মূলত সরালি, পিনটেইল ও খয়রা চকাচকি প্রজাতির পাখির আধিক্য দেখা যায়। এছাড়া এখানকার ঘন বন ও দুর্লভ গাছপালা ক্যাম্পাসকে দেশের অন্যতম জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবে গড়ে তুলেছে। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি শীতে অসংখ্য প্রকৃতিপ্রেমী এই ক্যাম্পাসে ভিড় জমান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বনভূমি, বাগান এবং জলাশয় শুধু পাখিদের জন্যই নয়; শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও সচেতনতা অর্জন করে। এটি শিক্ষার্থীদের পরিবেশগত চেতনা ও নৈতিকতা গড়ে তুলতেও সহায়ক।

গুণী প্রাক্তন শিক্ষার্থী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দেশের ক্রীড়া, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেছেন। নাট্যকার সেলিম আল দীন, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি, ফারুক আহমেদ, ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম, জয়া আহসান এবং বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহার মতো গুণীরা এই ক্যাম্পাসেরই সন্তান। তাঁদের সাফল্য জাহাঙ্গীরনগরের মানকে বিশ্বজুড়ে উজ্জ্বল করেছে যা প্রতিফলিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, ঐতিহ্য ও প্রভাব।

পাঁচ দশকের বেশি সময়ের পথচলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রমাণ করেছে—এটি কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি চেতনা, একটি আন্দোলন এবং একটি জীবন্ত সংস্কৃতি। সবুজ প্রান্তরে গড়ে ওঠা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজও প্রতিবাদের ভাষা শেখায়, মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা একত্রে এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন যা দেশের জন্য গর্ব এবং শিক্ষার জন্য অনন্য এক দৃষ্টান্ত।

সবুজ ক্যাম্পাসে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র: জাবি WRC

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রতিবাদের নগর: জাহাঙ্গীরনগর

প্রকাশের সময় : ০৪:৩৫:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

ঢাকা নগরীর কোলাহল ছাপিয়ে সাভারের সবুজ প্রান্তরে গড়ে ওঠা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি সংস্কৃতি, প্রকৃতি, আন্দোলন ও প্রতিবাদের এক অনন্য ঠিকানা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ফিরে দেখা এর ইতিহাস, অবদান ও স্বাতন্ত্র্য।

দেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি ব্যতিক্রমী নাম। এটি শুধু একটি শিক্ষাকেন্দ্র নয় বরং প্রকৃতি , সংস্কৃতি, আন্দোলন ও রাজনীতির এক জীবন্ত স্মারক। প্রতিটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শিক্ষার্থীকে সুযোগ দেয় এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে আবিষ্কার করার। সবুজের এই প্রান্তরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান যুগে যুগে দেশের শিক্ষা, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক বিকাশে অনন্য ভূমিকা রেখেছে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

ঢাকাকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার চাপ কমানো এবং একটি আধুনিক, পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাভারের নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশকে বেছে নেওয়া হয় পরিকল্পিত শিক্ষা নগরী হিসেবে। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি মাত্র চারটি বিভাগ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় টি জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় নামে যাত্রা শুরু করলেও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম উপাচার্য ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মফিজ উদ্দিন।

প্রথম ব্যাচে মাত্র ১৫০ জন শিক্ষার্থী এবং ২১ জন শিক্ষক নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়টি দ্রুত প্রসারিত হয়। নতুন নতুন বিভাগ ও অনুষদ স্থাপিত হয়, যা জাহাঙ্গীরনগরকে দেশের উচ্চশিক্ষার এক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে।

শিক্ষা কাঠামো

বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়টি অনুষদের অধীনে ৩৪ টি বিভাগ এবং ৪টি ইনস্টিটিউট ও গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪,০০০। সাত শতাধিক শিক্ষক এবং প্রায় ১৮০০ কর্মকর্তা- কর্মচারী নিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কলা, জীববিজ্ঞান থেকে শুরু করে পরিসংখ্যান, অর্থনীতি ও পরিবেশবিদ্যা—প্রতিটি শাখায় রয়েছে গবেষণাভিত্তিক পাঠদান।

পূর্ণ আবাসিক ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন এখানে শুধু ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ থাকে না; হলকেন্দ্রিক জীবনযাপন থেকেই গড়ে ওঠে নেতৃত্ব, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও খেলাধুলার কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে, যা তাদের সমগ্র বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সময় অবদান

১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় জন্মলগ্ন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর। নবীন ক্যাম্পাস হওয়া সত্ত্বেও এর শিক্ষক ও প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সরাসরি রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র কাজী আনিসুর রহমান জাবির প্রথম শহীদ শিক্ষার্থী হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
ক্যাম্পাসে অবস্থিত স্থপতি হামিদুজ্জামান খানের ‘সংশপ্তক’ ভাস্কর্য এবং ৭১ ফুট উচ্চতার দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনার আজও শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা জোগায়।
শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে, যা নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে।

উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ, শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও নাগরিক চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশ নয়, তারা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের অংশীদার হিসেবে কাজ করে চলেছে।

সংস্কৃতি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমান্তরালে এ ক্যাম্পাসে গড়ে উঠেছে এক ঋদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাট্যতত্ত্ব বিভাগ এই বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়, যা নাট্যচর্চায় বিপ্লব এনেছে। প্রতি বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলা, হিম উৎসব এবং বর্ণিল বর্ষবরণ অনুষ্ঠান জাবির আঙিনাকে মুখরিত রাখে। সেলিম আল দীন ও হুমায়ুন ফরীদির মতো কিংবদন্তিদের পদচারণায় ধন্য এই ক্যাম্পাসে মুক্তমঞ্চের নাটক থেকে শুরু করে দেয়ালিকা ও আবৃত্তি চর্চা এক ভিন্ন মাত্রা পায়। অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল এই সাংস্কৃতিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

প্রকৃতি ও অতিথি পাখির অভয়ারণ্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মানেই সবুজ, জলাশয় আর মুক্ত প্রকৃতি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র আবাসিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা ‘অতিথি পাখির স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে পরিচিত। লাল মাটির এই ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় অসংখ্য জলাশয় ও লেক শীতকালে সুদূর সাইবেরিয়া ও হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা হাজারো পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। এই অভয়ারণ্যে মূলত সরালি, পিনটেইল ও খয়রা চকাচকি প্রজাতির পাখির আধিক্য দেখা যায়। এছাড়া এখানকার ঘন বন ও দুর্লভ গাছপালা ক্যাম্পাসকে দেশের অন্যতম জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবে গড়ে তুলেছে। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি শীতে অসংখ্য প্রকৃতিপ্রেমী এই ক্যাম্পাসে ভিড় জমান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বনভূমি, বাগান এবং জলাশয় শুধু পাখিদের জন্যই নয়; শিক্ষার্থীরা প্রকৃতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে গবেষণা, পর্যবেক্ষণ ও সচেতনতা অর্জন করে। এটি শিক্ষার্থীদের পরিবেশগত চেতনা ও নৈতিকতা গড়ে তুলতেও সহায়ক।

গুণী প্রাক্তন শিক্ষার্থী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দেশের ক্রীড়া, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেছেন। নাট্যকার সেলিম আল দীন, অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি, ফারুক আহমেদ, ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম, জয়া আহসান এবং বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহার মতো গুণীরা এই ক্যাম্পাসেরই সন্তান। তাঁদের সাফল্য জাহাঙ্গীরনগরের মানকে বিশ্বজুড়ে উজ্জ্বল করেছে যা প্রতিফলিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মান, ঐতিহ্য ও প্রভাব।

পাঁচ দশকের বেশি সময়ের পথচলায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রমাণ করেছে—এটি কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি চেতনা, একটি আন্দোলন এবং একটি জীবন্ত সংস্কৃতি। সবুজ প্রান্তরে গড়ে ওঠা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজও প্রতিবাদের ভাষা শেখায়, মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা একত্রে এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন যা দেশের জন্য গর্ব এবং শিক্ষার জন্য অনন্য এক দৃষ্টান্ত।