ঢাকার এক শান্ত অলিযার গলি থেকে বেরিয়ে আসা ১৮ বছরের সাদাত রহমান আজ বাংলাদেশের প্রযুক্তি অঙ্গনে এক অনন্য প্রতিকৃতি। তার যাত্রাপথ মাত্র দু’হাত ও এক ল্যাপটপ দিয়ে তৈরি, কিন্তু তার স্বপ্ন অত্যন্ত ভীষণ! সাইবার-বুলিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে একটি নিরাপদ ডিজিটাল পৃথিবী গড়ে তোলা।
সাদাতের জীবনের শুরুটা ছিল সাধারণ। মাগুরার এক গ্রামের ছেলে হিসেবে ছোটবেলা থেকেই ছিল কৌতুহলী মন। কিন্তু মাত্র স্কুলবয়সে যখন সে প্রথমবার অনলাইনে বুলিং-এর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা দেখল, তখনই তার অন্তরের শ্রোতা জেগে উঠল। তার সিদ্ধান্ত স্পষ্ট ছিল: শুধু ভুক্তভোগী নাও হতে পারে, পরিবর্তনও আনতে পারে সে নিজেই।
২০২০ সালে, মাত্র ১৭ বছর বয়সে, সাদাত তার প্রথম প্রয়াস শুরু করল Cyber Teens , একটি অ্যান্টি সাইবার বুলিং মোবাইল অ্যাপ। অ্যাপটি শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ছিল না, এটি তার মানসিক সংকটের প্রতিক্রিয়া, তার ন্যাযোগ্যতার প্রতি জিজ্ঞাসা। এই প্রজেক্টের মাধ্যমে কিশোররা সহজেই তাদের সাইবার সমস্যাগুলি রিপোর্ট করতে পারে, এবং সিস্টেমটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে এটি তথ্য গোপন রাখে এবং মামলা নথিবদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ সঙ্কলন করে।
তার প্রয়াস শুধু তার নিজের জন্য ছিল না এটি পুরো জেনারেশনের জন্য ছিল। “আমি চাই আমার মতো অনেকে জানুক আপনি একা নন, আপনার কণ্ঠ আছে, এবং আমরা শুনছি,” বলেছিলেন সাদাত এক সাক্ষাৎকারে। এই অনুভূতির ভিত্তিতে, তার অ্যাপ ইতিমধ্যেই অনেক কিশোরকে দিশা দেখাচ্ছে, এবং একাধিক সাইবারক্রিমিনাল এর বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের হয়েছে।
তার সাফল্য ভুলভাল জায়গা থেকে আসেনি! তার পথ ছিল ক্লান্তিকর, চ্যালেঞ্জে ভরা। ঢাকার ক্যাম্পাস বিপিওর ব্যস্ততার মাঝে, সাদাত রাত জেগে কাজ করত, কোড লিখত, বন্ধুদের পরামর্শ নিত এবং পুনরায় ডিজাইন করত। তার পরিবার ছিল তার অন্যতম শক্তিশালী সহায়ক। যদিও তারা প্রযুক্তি বিশ্বে অভিজ্ঞ ছিল না, তারা তার স্বপ্নকে মান্যতা দেয় এবং তাকে উৎসাহ দেয়।
যদিও সমান সাফল্য আসে, সাদাত জানে তার যাত্রা এখানেই শেষ নয়। তার পরিকল্পনা আছে একটি বিস্তৃত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেখানে কিশোররা মানসিক স্বাস্থ্য, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সচেতনতা,সংক্রান্ত শিক্ষা পাবে। তিনি বিশ্বাস করেন, “শুধু টুল তৈরি করলেই হবে না! আমাদেরকে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, সুদূরপ্রসারী শিক্ষা দিতে হবে।”
তার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক মঞ্চেও এসেছে! সাদাত ২০২০ সালে ইন্টার আন্তর্জাতিক শিশুতোষ শান্তি পুরুষ্কার জিতেছিলেন। তিনি শুধু একজন অ্যাপ ডেভেলপার নন, বরং একটি সামাজিক আন্দোলনের নেতা, যিনি নতুন প্রজন্মকে বলছেন “আপনার কণ্ঠ শক্তিশালী, আপনার গল্প গুরুত্বপূর্ণ।”
সাদাতের বাবা-মায়ের চোখে আজ গর্ব ঝিলিক ফেলে। তারা বলছেন, “সে শুধু ছেলে নয় সে এক আদর্শ, এক প্রতীক।” মাগুরার সেই সাধারণ বাসভবনে জন্ম নেওয়া বালক এখন প্রযুক্তির জগতে তার দৃঢ় উপস্থিতি রেখে গেছে, এবং তার প্রতিভা দেশি কমিউনিটিকে নতুন দিশা দিচ্ছে।
সাদাতের জীবনে প্রযুক্তি শুধু একটি মাধ্যম নয়; এটি তার অস্ত্র, তার ভাষা, তার মঞ্চ। আর তার পথচলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যে পরিবর্তন আমরা চাই তা আসতে পারে এক তরুণের অভ্যুদয়ে, এক কোড-লাইন থেকে শুরু হয়েও। সাদাত রহমান এই পরিবর্তনের প্রতীক, এবং তার প্রতিজ্ঞা পাকিস্ত্রি নয় প্রভৃতি।
লেখক: মো: ফজলে রাব্বী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
এবিএন ডেস্ক 

























